এনআরবি সাফল্য

কানাডায় স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশি মঈনের সফল স্টার্টআপ

post-img

সময়টা ২০০০ সাল। সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সুনামগঞ্জের শ্যামনগর গ্রামের ছেলে মোহাম্মদ মঈন। সেই সময়ই স্কুলশিক্ষক বাবা শামসুল ইসলামের ক্যানসার ধরা পড়ে। কিন্তু তখন ক্যানসারের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশে পাচ্ছিলেন না। যা-ও পাচ্ছিলেন, সেগুলোর দাম ছিল সাধ্যের বাইরে। এমন বাস্তবতায় ছয় মাস চিকিৎসার পর মারা যান মঈনের বাবা।

ক্যানসারে বাবার মৃত্যু মোড় ঘুরিয়ে দেয় মঈনের জীবনের। মঈনের বাবার মতো দুরবস্থা যাতে আর কারও পড়তে না হয়, সে জন্য কানাডায় গিয়ে গড়ে তোলেন ওষুধ তৈরির প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ সোমরু বায়োসায়েন্স কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির সময় ও দাম কমিয়ে আনতে প্রযুক্তিগত সেবা দেওয়া।

সম্প্রতি কানাডা থেকে সংক্ষিপ্ত সফরে দেশে আসেন মোহাম্মদ মঈন। তখন ভিনদেশে গড়ে তোলা তাঁর স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সুত্রের । এ সময় মঈন বলেন, বাবা যখন অসুস্থ ছিলেন, তখন ক্যানসার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না আমার। বড় ভাই তখন যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ তৈরির একটি গবেষণাগারে কাজ করতেন। বাবার জন্য তিনি যেসব ওষুধের কথা বলেছেন, সেগুলোর অধিকাংশ দেশে পাইনি। যেগুলো পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলোর দামও ছিল অনেক বেশি। তখনই ঠিক করেছিলাম, মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কীভাবে আরও সহজে ও সাশ্রয়ী দামে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে কাজ করব।

ছোটবেলা থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়ার আগ্রহ ছিল মোহাম্মদ মঈনের। সেই আগ্রহ থেকেই ২০০১ সালে কানাডার অন্টারিও অঙ্গরাজ্যের ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স ও বায়ো ইনফরমেটিকস বিষয়ে পড়তে যান তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির চিন্তা ছিল তাঁর। কিন্তু দেশটিতে তখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। এ কারণে দ্বিতীয় বর্ষে এসে কানাডার পূর্বাঞ্চলীয় প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান।

তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিতে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেন। চতুর্থ বর্ষে থাকা অবস্থায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দিহান আহসানের সঙ্গে। বিয়ের পর দুজন মিলে প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড আইল্যান্ডের একটি বাড়ির নিচতলায় একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। ২০০৭ সালে একটি প্রযুক্তি কোম্পানিতে ওষুধের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মঈন। ২০১২ সালে যোগ দেন অন্য আরেকটি প্রযুক্তি কোম্পানিতে। আর ওই বছরই শুরু হয় তাঁর সোমরু বায়োসায়েন্স কোম্পানির যাত্রা।

মঈনের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম তখন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি অ্যামজেন ও কোভ্যান্সের (বর্তমান ল্যাবকর্প ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট) ওষুধের মান যাচাই প্রকল্পে কাজ করতেন। বড় ভাইয়ের ছিল ওষুধ তৈরির অভিজ্ঞতা, আর মঈনের ছিল প্রযুক্তিগত দক্ষতা। তাই মঈন ভাবলেন, দুই ভাই মিলে নতুন কিছু শুরু করা যায়।

কানাডার এ বাংলাদেশি উদ্যোক্তা জানান, সাধারণত বায়োলজিক্যাল ওষুধ তৈরির বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে একটি ওষুধ বাজারে আনতে ১০ বছরের মতো সময় লাগে। এসব ওষুধের দাম অনেক বেশি থাকে। এ ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি দেয় বায়োসিমিলার ওষুধ। পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ব থাকা বায়োলজিক্যাল ওষুধের অনুলিপি যেকোনো কোম্পানি তৈরি করতে পারে। এটিকে বলা হয় বায়োসিমিলার ওষুধ। মেধাস্বত্বের মেয়াদ শেষ হলেই কেবল এ ধরনের ওষুধ বাজারে আনতে পারে অনুলিপি করা কোম্পানি। এতে কম সময়ে ও সাশ্রয়ী দামে বাজারে ওই ওষুধ আনা সম্ভব। তাই বায়োসিমিলার ওষুধ নিয়েই কাজ শুরু করেন মঈন ও তাঁর ভাই।

মঈনের স্কুলশিক্ষক বাবা সিলেটে ‘সোমরু মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাই তাঁর নামেই ২০১২ সালে সোমরু বায়োসায়েন্স কোম্পানির নিবন্ধন নেন তিনি। মাত্র এক লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগে স্টার্টআপ কোম্পানিটির যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। শুরুর দিকে কানাডার প্রাদেশিক ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের ইনকিউবেশন সেন্টারে একটি জায়গা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। পরে ২০১৪ সালে নিজস্ব জায়গায় স্থাপন করেন গবেষণাগার।

বর্তমানে মঈনের সোমরু বায়োসায়েন্সে অর্ধশতাধিক বিশেষজ্ঞ ও কর্মী কাজ করেন। দুই ভাইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মঈনের স্ত্রী দিহান আহসান ও ভাবি ক্লারিন্ডা ইসলাম।

কানাডার ফেডারেল ও রাজ্য সরকার থেকে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ও অর্থসহায়তা পেয়েছে সোমরু। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বায়োলজিক্যাল ওষুধ তৈরির বিভিন্ন ধাপে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়। যেমন ওষুধের ধরন নির্ণয়ের পরীক্ষা, বৈশ্বিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে দেওয়া, তথ্য বিশ্লেষণ করা, ওষুধের নিরাপত্তা ও ইফিক্যাসি যাচাই করা, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সির (ইএমএ) অনুমোদন জোগাড় করে দেওয়া, ওষুধ বাজারজাতের অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এ ছাড়া কিট ও বায়োমেকার ডিটেকশন (ওষুধ শরীরে কীভাবে কাজ করে তা যাচাই) সেবাও দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটির পণ্য ও সেবার মূল বাজার যুক্তরাষ্ট্রে, এরপর রয়েছে ইউরোপ।

এ ছাড়া ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে ২০২১ সালে একটি গবেষণাগার স্থাপন করে সোমরু। চলতি বছর বেঙ্গালুরুতে দ্বিতীয় গবেষণাগার স্থাপন করতে চলেছে তারা। বর্তমানে বিশ্বের ২৩টি দেশের শতাধিক কোম্পানির সঙ্গে ১১২ ধরনের ওষুধ নিয়ে কাজ করছে সোমরু।

বাংলাদেশেও বায়োসিমিলার ওষুধ তৈরির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান মঈন। এটা করা গেলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ ধরনের ওষুধ দেশ থেকে রপ্তানি করাও সম্ভব হবে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ইতিমধে৵ কানাডার ফেডারেল সরকার থেকে পুরস্কার পেয়েছে সোমরু।

ভবিষ্যতে বিশ্বের শীর্ষ বায়োসিমিলার প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এ স্টার্টআপ কোম্পানিটি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেরাই নতুন বায়োলজিক্যাল ওষুধ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচ ধরনের ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে কাজ করছে সোমরু। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সিলেটে প্রতিষ্ঠা করেছে সোমরু ফাউন্ডেশন।

মঈন বলেন, ‘বাবার মৃত্যু আমার জন্য একটি বার্তা ছিল। কম দামে সাধারণ মানুষ যেন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কিনতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।’

সূত্র- প্রথম আলো 

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.