এনআরবি সাফল্য

নিউইয়র্কের খলিল বিরিয়ানি ও মেধাবী এক পাচকের গল্প

post-img

মাহমুদ মেনন

কাটলারির ঝনঝন শব্দ, রান্নার কড়াইয়ে তেল-পেয়াজের ভিজভিজ আওয়াজ কিংবা আঁচওঠা উনুনে হঠাৎ ঝলসে ওঠা আগুন এসবই ভালো লাগে খলিলের। দিনে রান্না ঘরে কাটে তার ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। আর তার হাতের যাদুতে সুস্বাদু হয়ে তৈরি হয় নানারকম খাবার। পুরো নাম মো. খলিলুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভাগ্যের সন্ধানে ফেরা মানুষটি তার ভাগ্যের দেখা পেয়েছেন এই রান্নার চুলোয়, তেল-পেয়াজ-আলু-পোস্তয় আর থালা-চামচের সমারোহে। বেছে নিয়েছেন পাচকের জীবন। ইংরেজিতে আমরা বলি শেফ। সেটাই এখন তার সোনালী জীবন। বললেন, "প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে এসেছিলেন, প্রতিদিন তার জন্য খাবার পাঠিয়েছিলাম, শুনেছি তিনি মজা করে খেয়েছেন।"


কেবল কি শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের সেনেটর, মেয়র, অ্যাসেম্বলিম্যান, কাউন্সিলম্যানরা চেখে দেখেছেন খলিলের রান্না। প্রশংসা করেছেন। দিয়েছেন সাইটেশন, সনদ। খলিলুর রহমানের বিরিয়ানি হাউজে এসে তাকে পাশে নিয়ে ছবি তুলেছেন। সেসব ছবি বড় করে বাঁধাই করে বিরিয়ানি হাউসে সাজিয়ে রেখেছেন খলিল। তার দোকানের দেয়ালগুলো এখন সনদ, শংসাপত্রে ঠাসা।

এটাই স্বার্থকতা, আর কীই চাই! বললেন খলিলুর রহমান। সত্যিই কি আর চাওয়ার থাকতে পারে একজন বিরিয়ানী ব্যবসায়ীর। যখন তার দেয়ালে শোভা পায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল লাইভটাইম অ্যাচিভমেন্ট সার্টিফিকেট। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্বাক্ষরিত।


এসব খলিলকে গর্বিত করে। তবে তিনি আজও সবচেয়ে বেশি গর্বিত হন, যখন তার রান্না করা খাবার খেয়ে কেউ বলেন, বেশ মজা হয়েছে। খাবারটি তার জন্য উপভোগ্য ছিলো।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্বাক্ষরিত এই সনদ পাওয়ার অনেক আগেই খলিলুর রহমান বানিয়েছিলেন এক স্পেশাল বিরিয়ানি। যার নাম দিয়েছিলেন বাইডেন বিরিয়ানি। সেই নামের সাথে এই সনদের কোনো যোগসাজশ আছে কি? সে প্রশ্নে এক গাল হেসে খলিলুর বললেন, একেবারেই নেই। যেদিন প্রথম আমি বিরিয়ানির বিশেষ পদটি, সম্পূর্ণ নিজস্ব রেসিপিতে রান্না করি সেদিনটি ছিলো প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রেসিডেন্সিয়াল শপথ নেওয়ার দিন। সকলে তাকে বিভিন্নভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। কেউ ফুল দিয়ে, কেউ শুভেচ্ছাবাণি লিখে। আমি তার জন্য একটি নিজস্ব রেসিপি বানিয়ে বিরিয়াণি রান্না করে সকলকে খাওয়ালাম। সেটাই ছিলো আমার নতুন প্রেসিডেন্টের প্রতি শুভেচ্ছা। কাজটি আমি করেছি স্রেফ ভালোবাসা থেকে।


এই ভালোবাসার গভীর সম্পর্ক খলিলুর রহমান গড়েছেন তার তৈরি খাবারের খদ্দেরদের সাথে। তিনি বলেন, মূল চিন্তাটি থাকে খদ্দের আমার তৈরি খাবার খেয়ে তার স্বাদ উপভোগ করতে পারলেন কিনা। তবে তেল-মসলায় জবজবে করে খাবার রান্না করা আমার কর্ম নয়। আমি চাই খাবারটি সুস্বাদু হবে ঠিকই তবে তা যেনো হয় স্বাস্থ্যকর। সে কারণে মসলার বাহুল্য যেমন আমার খাবারে থাকে না, তেমনি থাকে না তেল-ঘিয়ের মাখামাখি। এ জন্য যথেষ্ট মেধা খাটাতে হয়, পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়, আর সর্বোপরি রাখতে হয় সর্বোচ্চ মনোযোগ। সে কারণেই আমরা খাদ্যপ্রেমি মানুষগুলোকে সেই খাবারই দিতে পারছি যা তাদের জন্য হয় স্বাস্থ্যকর। এটাই আমার খদ্দেরের প্রতি একমাত্র ভালোবাসা।

কথাটি আরও গভীর উপলব্দির সাথেই উচ্চারণ করলেন মো. খলিলুর রহমান। তিনি বললেন, আমাদের দোকানে কেবল বয়ষ্করাই খেতে আসেন, তা নয়। তারা সাথে করে নিয়ে আসেন তাদের সন্তানদেরও। যারা এ দেশের নাগরিক। এদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতেও বড় হচ্ছে। এদেশে রয়েছে তাদের অপার সম্ভাবনা। আমার তৈরি খাবার মজা করে খায় নতুন প্রজন্মের এই ছেলে-মেয়েরাও। তাদের সুস্বাস্থ্যের দিকটি আমাদের চূড়ান্ত বিবেচনায় রাখতে হবে। সে কারণে এই খাবার রান্নাকে আমি কোনোভাবেই স্রেফ ব্যবসা হিসেবে দেখি না। আমি এটাকে সেবা হিসেবে দেখি, সর্বোপরি দেখি দায়িত্ব হিসেবে, বলছিলেন খলিলুর রহমান।

খলিলুর রহমানের সঙ্গে আরও কথা হলো নানা বিষয়ে তবে সেগুলোর আগে আসুন আমরা নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে খলিল বিরিয়ানির পসরা কতটুকু বিস্তৃত তা দেখে আসি।

এটা নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস। ১৪৫৭, ইউনিয়ন পোর্ট রোড এটাই খলিলুর রহমানের মালিকানাধীন খলিল'স ফুডের ঠিকানা। এর আওতায় রয়েছে চারটি পৃথক প্রতিষ্ঠান

- খলিল'স বিরিয়ানি হাউস
- খলিল হালাল চায়নিজ
- খলিল পিজা অ্যান্ড গ্রিল
- খলিল সুপার মার্কেট

বড় মার্কেটে বড় বড় চারটি দোকান। তবে খলিল বিরিয়ানি হাউসের মূল যে দোকানটি সেটি সেটি অপেক্ষাকৃত ছোট। ঠিক সড়কের উল্টো দিকে। যেখান থেকে খলিলুর রহমানের যাত্রা শুরু। এই দোকানটি এখনো তার সবচেয়ে প্রিয়। সেখানে কাউন্টার থেকে কথা বলছিলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। বলছিলেন তার স্বপ্নপূরণের কাহিনী।


যুক্তরাষ্ট্র এসে আরও অনেকের মতো তিনিও একসময়ে অডজব করেছেন। তবে হোটেলেই কাজ বেশি করেছেন। ডিশ ক্লিনিংয়ের কাজ দিয়েই শুরু হয় এই ঢাবি স্নাতকোত্তরের। তবে তখন থেকেই মনে তার দানা বাঁধতে থাকে স্বপ্ন। একবার ভেবেছিলেন আইটিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে, আরও অনেকের মতো সে খাতেই ভাগ্য গড়বেন। কিন্তু সে চিন্তা খুব বেশি দিন কাজ করেনি। বরং মনে ইচ্ছা পোষণ করতে থাকেন একসময় শেফ হওয়ার। সেই চিন্তাটিকে কেন্দ্রে রেখেই তিনি শিখে নেন কালিনারি... অর্থাৎ রান্নার প্রশিক্ষণ ও শিক্ষালব্দ জ্ঞান। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নিয়েই, নিজ দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের মানুষের প্রিয় খাবার বিরিয়ানি তৈরি ও বিক্রির উদ্যোগ নেন প্রথম। তাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় খলিল'স বিরিয়ানি হাউস। নিজের দীর্ঘ অড জব থেকে অর্জিত আয়, আর তা থেকে সঞ্চিত অর্থে মাত্র ৭০ হাজার ডলার খরচে কিনে নেন ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ছোট্ট দোকানটি। সেখানেই রান্না শুরু করেন বিরিয়ানি। সেটা ২০১৭ সাল। এরপরের গল্প কেবলই এগিয়ে চলার। সেই ৭০ হাজারের পূজি লগ্নি করে আজ পাঁচ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসার মালিক এই খলিলুর রহমান।

একাগ্রতা আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাকে সাফল্য দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদটি তিনি দিতে চান তার তৈরি খাবারের খদ্দেরদের। খলিল বলেন, গ্রাহকই সবচেয়ে বড় কথা। আমি সেরা খাবার তৈরি করলাম, কিন্তু কেউ খেতে এলো না, তাতে আমার খাবার, তা যতই সেরা হোক, বিক্রি হবে না। তেমনি আবার গ্রাহক এলেন, খেলেন কিন্তু আমার খাবার মানসম্মত ছিলো না, তাহলে গ্রাহক চলে যাবেন। আর সর্বোপরি গ্রাহক খেলেন কিন্তু তৃপ্তি পেলেন না, তাতে ব্যবসা টিকবে না। সাথে রয়েছে একটি দামের প্রসঙ্গও। দাম যদি অনেক হয়, তা যদি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় তাহলে সে খাবারও খুব বেশি দিন কেউ খেতে আসবেন না। সুতরাং খাদ্যপ্রেমি মানুষের মুখের স্বাদ, পকেটের সামর্থ আর খাবারের সাধ এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে তিনি চেষ্টা করেন। তাতেই হয়তো এইটুকু সাফল্য এসেছে।

কেবল বিরিয়ানি নাম হলেও খলিলুর রহমান তার ব্যবসা বিস্তৃত করেছেন চায়নিজ ফুড, পিজা অ্যান্ড গ্রিলেও। আর নান, রুটি, পরোটা- মাংস এগুলোতো রয়েছেই। নতুন প্রজন্ম পিজা খেতে পছন্দ করে তাদের কথা মাথায় রেখে পিজা তৈরি শুরু করেন। এবং বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বললেন, তার তৈরি পিজায় স্বাদের শতভাগ গ্যারান্টি রয়েছে এবং ব্র্যান্ডেড সব পিজার চেয়ে স্বাদে-গুনে কম কিছু নয়। তেমনি তার তৈরি চায়নিজ খাবার, ফ্রায়েড রাইস, ফ্রায়েড চিকেন, স্যুপ, ভেজিটেবল, চিকেন সিজলিং কিংবা বিফ চিলিজ এসবও বেশ সুস্বাদু ও জনপ্রিয়।

এত বড় ব্যবসা এক হাতে সামলান। তবে কর্মচারি ও সহকর্মীর সংখ্যা এখন শতাধিক।

তার যে সুপার মার্কেট রয়েছে তাতে বিক্রি হয় মাছ-মাংস শাক-সব্জি। খলিল বলেন, তাজা তাজা খাদ্যপণ্য বিক্রির সুবাদে তার সুপারমার্কেটও এখন বেশ জমে উঠেছে। খলিল জানান, এই সুপারমার্কেটে কখনো বাঁসি গরুর মাংস, চিকেন বিক্রি হয় না। বললেন, সুপার মার্কেটে যে মাংস তোলা হয়, তার একটি বড় অংশই যায় তার প্রতিষ্ঠিত বিরিয়ানি হাউজ ও অন্য দোকানগুলোয়। আর বাকিটা দিনে দিনে খদ্দেররা কিনে নিয়ে যান। এতে প্রতিদিনই নতুন মাংস ওঠে। দিনশেষে বিক্রি হয়ে যায়।


রান্না ঘরে খলিলকে ব্যস্ত দেখে সেখানে দাঁড়িয়েই কথা হচ্ছিলো। দক্ষ, শক্ত হাতে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ওলট-পালট করছিলেন কড়াই ভর্তি চওমিন ও ফ্রায়েড রাইস। বললেন, এগুলো করতেই তার সবচেয়ে ভালো লাগে। তাকে এক সঙ্গে তদারকি করতে হয়, ক্যাশ-কাউন্টার সামলাতে হয়। তবে এসবে এখন সিদ্ধহস্ত এক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের স্নাতকোত্তর এই খলিলুর রহমান।

কথায় কথায় চলে গেলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। বললেন, বিশ্ববিদ্যলয় জীবনে একবার বন্ধুদের দাওয়াত দিয়েছিলাম গরুর মাংস রান্না করে খাওয়াবো বলে। তারা এলো কিন্তু আমার রান্নায় এতো লবন হয়েছিলো যে খাওয়া যাচ্ছিলো না। এতে আমার রোখ চেপেছিলো। এরপর আবারও মাংস রান্না করে বন্ধুদের দাওয়াত করলাম। তারা পেটপুরে চেটেপুটে খেলো।

এই চেটেপুটে খাওয়া কাউকে খেতে দেখলে বেশ আনন্দ লাগে খলিলুর রহমানের। বললেন, খাবার স্বাদ হলেই খাদ্যপ্রেমিরা চেটেপুটে খান। আর সেটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।

খলিল ফুডের চারটি দোকানের মধ্যে তিনটিই রেস্টুরেন্ট। এগুলো খাদ্য তালিকায় রয়েছে শতেক পদ। তবে খলিলের বিরিয়ানিটাই সকলের পছন্দ। খলিলের কাচ্চি বিরিয়ানি, গোট বিরিয়ানি, ল্যাম্ব বিরিয়ানি, বিফ বিরিয়ানি, ভেজিটেবল বিরিয়ানি এসবতো রয়েছেই, সাথে নানা পদের মাছ, ভর্তা-ভাত, রুটি সব্জি, মাংস রেজালা, ভাজাভুজি কি নেই খলিলের দোকানে। সবশেষ যুক্ত হয়েছে পিজা। তার সঙ্গে দই-মিষ্টিসহ আরও হরেক খাবার, হরেক পদ।

গ্রাহকরা খলিলুর রহমানের চোকানে এলে কিছু না কিছু সেরা পছন্দের খাবার পেয়েই যান। তৃপ্তি করে খান। আর বলেন- বেজায় ভালো। 

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.