যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করেছেন এদেশের শিক্ষা ঋণের বোঝা যারা বইছে, তা কিছুটা লাঘব করা হবে। এখন যাদের আয় বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার ডলারের কম তাদের প্রত্যেকের ঋণের বোঝা থেকে ১০ হাজার ডলার করে মওকুফ করা হবে। আর যারা নিম্ন আয়ের কারণে পেল-গ্র্যান্টস পাচ্ছেন তারা মওকুফ পাবেন ২০ হাজার ডলার করে।
ডেমোক্র্যাটরা দীর্ঘ সময় ধরে এই ঋণ মওকুফের ব্যাপারে চাপ দিয়ে আসছিলেন। তাদের প্রত্যাশার কিংবা দাবির চেয়ে মওকুফের অংক কম হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আসা এই ঘোষণাকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
এর মধ্য দিয়ে মানুষগুলো ঋণের পাহাড় থেকে কিছুটা হলেও সস্তির জায়গায় পৌঁছাবে, বলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি বলেন, এই মানুষগুলো এখন হয়তো একটি বাড়ি কেনার কথা, কিংবা পারিবারিক জীবন শুরুর কথা কিংবা একটি ব্যবসা শুরুর কথা ভাবতে পারবেন।
বাইডেন এসময় কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে শিক্ষাঋণের কিস্তি স্থগিত রাখার কথা উল্লেখ করেন, যা ২০২০ সালের মার্চ থেকে কার্যকর করা হয় এবং সে বছরের শেষ মাস অবধি চলে।
সেন্ট লুইসের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিক্ষার্থীদের ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি) ডলার; ২০০৬ সালে যা ছিল ৪৮১ বিলিয়ন (৪৮ হাজার ১০০ কোটি) ডলার। মার্কিন শিক্ষার্থীদের এ ঋণের পরিমাণ বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
‘দ্য এডুকেশন ডেটা ইনিশিয়েটিভ’ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছর মেয়াদি কোর্স করার টিউশন ফি ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণা গ্রুপ ‘দ্য এডুকেশন ডেটা ইনিশিয়েটিভ’ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছর মেয়াদি কোর্স করার টিউশন ফি ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও অনেক দেশ যেমন: জার্মানি, আইসল্যান্ড ও সুইডেনে টিউশন ফি হয় নির্ধারিত, না হয় সম্পূর্ণ ফ্রি। যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছরের কোর্স করতে বছরে একজন শিক্ষার্থীর খরচ হয় গড়ে ৩৫ হাজার ৫৫১ ডলার। খরচের খাতের মধ্যে আছে টিউশন, বিবিধ ফি, আবাসিক হল ফি, বই, অন্যান্য খরচ—বলছে ন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস।
যুক্তরাষ্ট্রে একজন শিক্ষার্থী যে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আবেদন করে, সে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কতটুকু উপযুক্ত, সেটি নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তাঁর পড়াশোনার ব্যয় বহনের ব্যক্তিগত সক্ষমতা, পরিবারের সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে থাকে। পরে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ফেডারেল অনুদান, ভর্তুকিতে ঋণ, কাজের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। এরপরই পড়াশোনার অবশিষ্ট খরচ মেটাতে ঋণের আবেদন করতে পারেন শিক্ষার্থী।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মুডিস’–এর অর্থনীতিবিদ ক্রিশ্চিয়ান ডেরিটিসের ভাষায়, ‘আমার মনে হয় তরুণ–তরুণীরা আসলেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। তাঁদের অনেকেরই ঋণের বোঝা আসলে কেমন ও স্নাতক শেষে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ছয় অঙ্কের বেতনের স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেই।’
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, প্রথম চাকরিতে তাঁরা বছরে মোটামুটি ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮০ ডলার বেতন পাবেন। তবে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। দেখা গেছে, স্নাতক শেষে চাকরিতে ঢোকার পর বছরে একজন গড়ে ৫৫ হাজার ২৬০ ডলার বেতন পেয়ে থাকেন।
নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাব বলছে, পকেটে টান পড়লে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের নির্ভরশীলতা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে দেশটিতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে করোনার সময় জমানো অর্থে হাত দিয়েছে মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে খুব শিগগির ঋণখেলাপি বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ক্রিশ্চিয়ান ডেরিটিস। তাঁর ভাষ্যমতে, সরকার যখন শিক্ষাঋণ পরিশোধ স্থগিত করল, তখনই অনেক ঋণগ্রহীতা সমস্যার মধ্যে ছিলেন। ভবিষ্যতে তাঁদের ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
