এনআরবি সাফল্য

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদ ড. মুশফিক মুবারকের বড় অর্জন

post-img

বিশ্বের দেশে দেশে মেধা ও মননশীলতায় আলো ছড়াচ্ছেন বহু বাংলাদেশি। উজ্জ্বল করছেন বাংলাদেশের নাম। এবার সেই তালিকায় যোগ হলেন আরও একজন। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদ ড. আহমেদ মুশফিক মুবারক।

যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির এ অধ্যাপক দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম ভক্স-এর বাছাই করা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৫০ ব্যক্তির তালিকা ‘ফিউচার পারফেক্ট ৫০’-এ স্থান করে নিয়েছেন।

বিশ্বে হাজারও বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, পণ্ডিত, লেখক ও অধিকারকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে যারা ভবিষ্যৎকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলতে নিজেদের মেধা ও মননকে কাজে লাগাচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকে সেরাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভক্স। সেই সেরাদের তালিকাতেই উঠে এসেছেন তরুণ অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারক।

‘বৈশ্বিক ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও ন্যায়বিচারহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই’ ক্যাটাগরিতে সম্মান দেয়া হয়েছে মুশফিক মুবারককে। তিনি দেখিয়েছেন, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) গৃহীত পদক্ষেপ মানুষের জীবনকে ভালো ও মন্দের দিকে টেনে নেয়। বিষয়টি সহজ মনে হলেও বিশ বছর ধরে হাতে-কলমে এ বিষয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন মুশফিক। উন্মোচন করেছেন অঞ্চল বা মানুষভেদে ভিন্ন ভিন্ন দিক। 

মুশফিকের জন্ম ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে। বেড়ে উঠেছেন ঢাকার কলাবাগানে। শিক্ষাজীবনের শুরুতে অল্প সময়ের জন্য ঢাকার সানবিমস স্কুলে গিয়েছিলেন।

এরপর সেখান থেকে চলে যান মোহাম্মদপুরের সেইন্ট জোসেফ স্কুলে। ভর্তি হন নবম শ্রেণিতে। সেখান থেকে তাকে ভারতের তামিলনাড়ুর একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর সেখান থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকালেস্টার কলেজ থেকে ১৯৯৯ সালে গণিত ও অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন মুশফিক। এতে চার বছরের জায়গায় তার সময় লাগে মাত্র তিন বছর। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন তিনি। পেশাগত জীবনে প্রথমে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হয়ে কাজ করেন মুশফিক।

এরপর ২০০২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোতে শিক্ষকতা শুরু করেন। চার বছর পর ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্যে আরও বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার প্রস্তাব পেলেও ইয়েল ইউনিভার্সিটিতেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালে এখানেই পূর্ণ অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

মূলত উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিবেশগত বিষয় নিয়ে কাজ করা মুশফিক তার নিজ দেশ বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, নেপাল, সিয়েরা লিওন ও ইন্দোনেশিয়ায় চলমান বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের কাজ করছেন।

ইকোনোমেট্রিকা, সায়েন্স, আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ, রিভিউ অব ইকোনমিক স্টাডিজ, দ্য আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ ও নেচারের মতো বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশ হয়েছে তার গবেষণা। গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে তিনি লাভ করেন কার্নেগি ফেলোশিপ।

ভক্সের প্রতিবেদনমতে, বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে স্যানিটেশনের মতো অনেক বিষয় নিয়েই গবেষণা রয়েছে মুশফিক মুবারকের। কিন্তু সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ মৌসুমি অভিবাসন বিষয়ে।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ নিম্নবিত্তদের কর্মহীন মৌসুমে যদি সাময়িকভাবে শহরে গিয়ে কাজ করার জন্য অর্থ দেয়া যায়, তাহলে সার্বিকভাবে তাদের পারিবারিক আয় বাড়ে। এ গবেষণার ওপর ভর করে নেয়া হয় নতুন উদ্যোগ ‘নো লিন সিজন’।

যারা সাময়িক কাজের জন্য শহরে যেতে চাইত, তাদের অর্থসহায়তা দেয়া হতো এর মাধ্যমে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষের দরজায় এই উদ্যোগ পৌঁছে যাওয়ার পর দেখা গেল উল্লেখযোগ্য তেমন ফল আসছে না। ফলে ২০১৯ সালেই বন্ধ হয়ে যায় ‘নো লিন সিজন’ প্রকল্প।

এখানেই স্পষ্ট হয় মুশফিক মুবারকের অনুসিদ্ধান্ত। একটি পদক্ষেপ কোনো একটি অঞ্চলে কার্যকরভাবে না-ও চলতে পারে। তবে অন্য কোনো নীতির যথাযথ প্রয়োগে আসতে পারে সাফল্য। যেখানে ভূমিকা রাখতে পারে সরকার ও অন্যান্য নীতিনির্ধারণী সংস্থা। ইয়েল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ অন ইনোভেশন অ্যান্ড স্কেলে (ওয়াই-আরআইএসই) মুবারকের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুই ছিল, নীতিনির্ধারণের যথাযথ ভূমিকা।

ওয়াই-আরআইএসআই ক্ষুদ্রঋণ, শরণার্থী ও শিশু উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। ফলে গবেষণা করতে গিয়ে মুবারকের অনুসিদ্ধান্তের বাস্তবতা দেখা যায়। অর্থাৎ, সরকারের নীতিগত পরিবর্তন লাখো মানুষের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

মুবারক দাবি করেছিলেন, বিশ্ব ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দুটি গ্রামে একটি প্রোগ্রাম সফল। তার মানে এই নয় যে, তা জাতীয় পর্যায়ে সফল হবে। বাংলাদেশে একটা প্রোগ্রাম কাজ করছে মানে এমন নয় যে, কেনিয়ায়ও ভালো কাজ করবে।

মুশফিকের আরেকটা গবেষণা হলো ‘স্পিললাভার এফেক্টস’ অর্থাৎ যারা কোনো প্রোগ্রাম থেকে সেবা গ্রহণ করেনি, তাদের ওপর ওই প্রোগ্রামের ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ফলাফল। মূলত টয়লেট সম্প্রসারণে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে গবেষণাটি হয়েছে।

এ ধরনের সহায়তার মাধ্যমে জীবাণুর বিস্তার রোধ হয়। যার উপকার কেবল সেবা গ্রহণকারীরাই পায়নি। যারা ভর্তুকি গ্রহণ করেনি, তারাও জীবাণুমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। ফলাফলের সূচক ছিল দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশে মহামারির প্রতিক্রিয়া ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নিয়ে এখন মুবারক কাজ করছেন। পৃথিবী নিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন মুশফিক মুবারক।

তার গবেষণা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেবে। এমন কর্মমুখর জীবন ও তার সফল গবেষণা ভক্সের পরিভাষায় ‘পারফেক্ট ফিউচার’ গড়ার কারিগরদের তালিকার পরিপূরক হওয়ারই যোগ্য।  

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.