যুক্তরাষ্ট্রে তারা সকলেই সক্রিয়, সফল এবং সদা ব্যস্ত। তারা এখানে প্রকৌশলী, স্থপতি কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। কেউ রয়েছেন এখানকার সরকারের উচ্চ কোনো পদে। কেউ রয়েছেন বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তি হিসেবে। আবার কেউ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে হয়েছেন বড় ব্যবসায়ী- উদ্যোক্তা।
তাদেরই একটি সংগঠন- নাম আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড আর্কিটেক্টস। সংক্ষেপে আবিয়া। প্রকৌশলী, স্থপতি, উদ্ভাবকদের সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার তথা বিশ্বের আরও দেশের নন রেসিডেন্সিয়াল বাংলাদেশিদের নিয়ে গঠিত এই সংগঠন।
আবিয়ার দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ২০২২ হয়ে গেল গত ৭, ৮ ও ৯ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিলান্ডে পোটোম্যাক নদীর তীর ঘেঁষা মনোরম পরিবেশে সাত তারকা বিশিষ্ট হোটেল গেলর্ডে আবাসিক এই সম্মেলনে টানা তিন দিন হোটেলে অবস্থান করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিলেন এর সদস্যরা।
তাতে তারা সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে সংগঠনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আরো কি করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করলেন, সিদ্ধান্ত নিলেন। যার কেন্দ্রে ছিলো বাংলাদেশ। অর্থাৎ দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তারা কে কি করতে পারেন স বিষয়েই আলোচনা।
আর একইসঙ্গে সময়টিকে তারা উপভোগ করলেন নানা আনন্দ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। যাতে ছিলো নাচ-গান-আবৃতি। আর ছিলো নৌভ্রমণ।
গোটা তিন দিন ধরে চলছিলো এক মিলন মেলা। সে মিলন মেলায় তারা যোগ দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।
তবে এবারের সম্মেলন ছিলো আরও বেশি অন্যরকম কারণ বাংলাদেশ থেকেও এসেছিলেন কয়েকজন প্রকৌশলী, স্থপতি তথা আইটি উদ্যোক্তা। যারা স্রেফ দেখতে আসেননি, এসেছিলেন বাংলাদেশে তাদের সাফল্যের গল্প শোনাতে। আর এখান থেকে সাফল্যের কথাগুলো জানতে।
দেওয়ার-নেওয়ার, মিলিবার-মেলাবার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছিলো এখানে।
শুক্রবার ছিলো সম্মেলনের প্রথম দিন। এই দিন সন্ধ্যায় ছিলো সোশ্যালাইজেশন ডিনার। আর মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বিকেলের মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে যান অংশগ্রহণকারীদের অনেকে। কারণ পারস্পরিক যোগাযোগ-দেখাশোনার এই সুযোগ তারা মিস করতে চাননি। হয়েছও তাই। মধ্যরাত পেরিয়ে সেখানে চলে গান-উৎসব আর মতবিনিময়। আর এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে আলাপ-পরিচয়। ছবি তোলা সেলফি সেসবতো ছিলোই।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চলতে থাকে একের পর এক সেমিনার। তাতে
- ন্যানোটেকনোলজি ফর দি এডভান্সড টারশিয়ারি ওয়েষ্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রসেস,
- এ স্মার্ট এপ্রিলের মনিটরিং সিস্টেম ফর ইন্টারনেট অব থিংস(আইওটি) এপ্লিকেশন ইন বাংলাদেশ,
- দি ট্রান্সপোর্ট প্রোটকল ইভোলুশন ইন দি ইন্টারনেট এন্ড চেঞ্জ অব ট্রাফিক প্যাটার্ন,
- বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন,
- চ্যালেঞ্জেজ অব টার্শিয়ারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ এন্ড রোল অব এলামনাই অ্যাট হোম এন্ড অ্যাবরোড,
- কনস্সট্রাকন অব পদ্মা ব্রিজ:চ্যালেঞ্জেজ এন্ড সোলিউশনস
- দি ইকোনমিকস এন্ড ইম্পিলিকেশনস অব দি পদ্মা ব্রিজ
- হাউ টু ডিজাইন ওয়াটার ফ্রন্ট স্ট্রাকচার সিম্পল এন্ড সেইফ
- স্টুডেন্ট লোন ক্রাইসিস এন্ড দি ফিউচার অব ইয়াং আমেরিকান
- ডেভেলপমেন্ট অব স্পেস প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ
- সেমিকনডাক্টর ফোরাম: মিনিংফুল কোলাবোরেশন বিটুইন বাংলাদেশ, ইউএসএ এন্ড আদার স্টেকহোল্ডার্স
- সিস্টেম সিমুলেশন গাইডিং ইনোভেশন টুয়ার্ডস অ্যাচিভিং নেয়ার-জিরো ইমিশনস ভেহিকলস
- জিডিপি পার-কেপিটা - এ হিস্টোরিক পার্সপেকটিভ অব ইকোনমিক গ্রোথ এন্ড মানিটরি ইকোনমিকস- বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এন্ড ভিয়েতনাম
- ডিজিটাল ক্লাউড ট্রান্সফরমেশন এন্ড ডেভসেকঅপস ইন ফিন্যানসিয়াল টেকনোলজি
- বাংলাদেশ-দি রাইজিং টাইগার: অ্যান ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল এক্সপেডিশন
- পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইন ঢাকা - প্রেজেন্ট ইস্যুজ/ডিরেকশনস এন্ড পোটেনশিয়াল সোলিউশনস/ইম্প্রুভমেন্টস
- ইট্রোডাকশন টু কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এন্ড হাউ ইট ক্যান বেনিফিট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স
আলোচনার বিষয়বস্তুগুলোই বলে দেয় পৃথিবীর ঠিক উল্টো পাশে বসে দেশ নিয়ে কতটা আগ্রহ, আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সাথে তারা ভেবেছেন নিজের দেশ সম্পর্কে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথ ও প্রক্রিয়া সম্পর্ক।
কি-নোট স্পিকারদের একের পর এক উপস্থাপনা হলভর্তি দর্শকদের জন্য তৈরি করে নানা-কিছু জানা ও শোনার সুযোগ।
অন্যান্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম সফল আইটি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষা উদ্যোক্তা ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি- ডব্লিউইউএসটি'র চ্যান্সেলর ও বোর্ড চেয়ারম্যান আবুবকর হানিপও এতে তার কি-নোট উপস্থাপন করেন। তিনি তুলে ধরেন শিক্ষাভিত্তিক সমাজের এই দেশে বাংলাদেশি আমেরিকানদের দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব ও নানা দিক।
ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (আই-ট্রিপল-ই)-এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ও ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাইফুর রহমান বলেন, এ ধরণের সম্মেলনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এ দেশে বসবাসরত অনেকের উদ্ভাবনী জ্ঞান ও দক্ষতা সম্পর্কে দেখার ও জানার সুযোগ পায় এবং বাংলাদেশের প্রকৌশল ও তথ্য প্রযুক্তির পেশার সাথে সম্পর্কিত পেশাজীবীদের সাথে ঐ জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের সূত্রপাত ঘটে।
দিনটি আরও সম্মৃদ্ধ ছিলো শিশুদের জন্য আয়োজিত বিজ্ঞান মেলা, ম্যাথ কুইজ ও ট্রিভিয়া দিয়ে। এদেশে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোররা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলো তাতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রকল্প নিয়ে।
ছিলো চাকুরি মেলা ও চাকুরি প্রদান, নেটওয়ার্কিং সেশন। ও ইয়ুথ ফোরামের প্যানেল ডিসকাশন।
দিন শেষে রাত নামলে অনুষ্ঠান জমে ওঠে আনন্দ আয়োজনে। তাতে ছিলো গান নাচ কবিতা আবৃত্তি। ইন্ডিয়ান আইডলের রক কুইন ও সারে গা মা পা-খ্যাত শিল্পী মনীশা কর্মকার, আধুনিক বাংলা গানের প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী এলিটা করিম ও অনিলা চৌধুরী প্রখ্যাত কবিতা আবৃত্তিকার প্রজ্ঞা লাবনীসহ আন্তর্জাতিক শিল্পীরা এতে পারফর্ম করেন। ছিলো স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনাও।
আর অনন্য নৃত্য উপস্থাপন করে এখানকার নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে অসাধারণ এক নৃত্যানুষ্ঠান। যা তুলে ধরে এক অগ্রসরমান বাংলাদেশকে।
পরে প্রখ্যাত অভিনেতা ও শিল্পী তাহসান খান যখন মঞ্চে ওঠেন তখন প্রায় মধ্যরাত। তার পরিবেশনায় একের পর এক গান দর্শকদের মুগ্ধ করে। গানের তালে নেচে ওঠেন এমন দর্শকের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিলো না।
আয়োজনের তৃতীয় দিনে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশি টেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্রেকআউট সেশন। পরে আবিয়া'র সংবিধান ও বাই-লজ নিয়ে আলোচনার পর সংগঠনটির এজিম সম্মন্ন হয়। এবং দুপুরে অত্যাধুনিক ইয়াটে সকলে যোগ দেন নৌভ্রমণে। পোটোম্যাক নদীতে সে ভ্রমণ সকলের মধ্যে যোগাযোগ ও আড্ডার মধ্য দিয়ে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। পোটোম্যাক নদীর দুই তীরে প্রকৃতি ও আধুনিক সব ভবনে সৃষ্ট মনোরম দৃশ্য দেখে সময় কেটে যায়। আর ইয়াটে মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন করে সকলে নেমে আসেন। আর ফিরে যান যে যার গন্তব্যে।
একটি মিলন মেলা ভাঙ্গে ঠিকই। কিন্তু এখানেই শুরু হয় আরও সম্মিলিত হওয়ার আরও একসঙ্গে কাজ করার নতুন সুযোগ। যা সংগঠনকে যেমন এগিয়ে নেবে। তেমনি এগিয়ে নেবে বাংলাদেশকে। যা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারই সকলে গ্রহণ করেছেন আবিয়ার এই তিন দিনের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে।
