পরিবেশটা ছিল বেশ আনন্দঘন। সোমবার (৪ এপ্রিল) উপস্থিত অভ্যাগতরা একটা সুন্দর সন্ধ্যা কাটালেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে। মৃদুমন্দ সুরে বেজে চলছিলো যন্ত্রসঙ্গীত। তার মধ্যে মৃদুভাষ্যে মানুষের কথোপকথন। উপলক্ষ্য বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন।
জমায়েতটা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬ টা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই ছিলেন সেখানে। নিমন্ত্রিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানিত অতিথিবৃন্দ।
প্রথম কিছুটা সময় কাটে একে অন্যের সাথে কুশল বিনিময় করে। এরপর অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তার সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শহীদুল ইসলাম আরও ছিলেন ইউএসএআইডির ডেপুটি এডমিন্সট্রেটর ইসোবেল কোলম্যান। ততক্ষণে যোগ দেন আরো অভ্যাগত অতিথিরা। তাদের উপস্থিতিতেই শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। যার শুরুটা হয়েছিল যন্ত্রে দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানোর মধ্য দিয়ে।
আলোচনার শুরুতেই এই উদযাপন উপলক্ষে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যন্থনি ব্লিংকেনের ভিডিও ধারণকৃত বক্তব্য প্রচার করা হয়।
এতে ব্লিংকেন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যে সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে গত ৫০ বছরে তা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংকট নিরসনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন অগ্রসরতা বাংলাদেশের তথা বাংলাদেশিদের ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে ব্লিংকেন বলেন, ১৯৭২ সালে ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্রে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছিলেন এবং এখানে পিএইচডি এবং দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯৭২ সালে দুই দেশের সম্পর্ক স্থাপনের এক বছর পর ১৯৭৩ সালে তিনি সিয়ার্স করপোরেশনের মতো অত্যাধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইন করেছিলেন, তখন থেকেই সেই টাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাসিক স্কাইলাইনের প্রতীক হয়ে রয়েছে, স্মরণ করেন ব্লিংকেন।
তিনি বলেন, এই একটি বিষয়ই বলে দেয় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কি করতে পারে।
ব্লিংকেন বলেন, আগামী দিনগুলোতে আমাদের দুই দেশের জনগণ মিলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কটি কিভাবে এগিয়ে নেবে সেদিকেই আমরা তাকিয়ে আছি।
এরপর বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সঙ্গে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা অব্যাহতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং ৫০ বছরে তা একটি শক্ত ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বক্তব্যে উল্লেখ করেন শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২২ নাল হচ্ছে সেই সম্পর্কের উদযাপনের বছর। গোটা বছরজুড়ে আমরা দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের শক্তির দিকটি প্রদর্শনের যেমন সুযোগ পেয়েছি তেমনি করে এই সম্পর্ককে আরও গভীরতা দিকে নিয়ে যেতে করণীয় নির্দেশ করতে পেরেছি।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কসম্পর্ক জোরদারে অংশীদারিত্ব সংলাপের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত জানান, গত ২০ মার্চ ঢাকায় অষ্টম অংশীদারিত্ব সংলাপ সম্পন্ন হয়েছে, আগামী ৬ এপ্রিল ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হবে ৮ম নিরাপত্তা সংলাপ এবং ৯ম প্রতিরক্ষা সংলাপ আগামী মেমাসের প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত হবে হাওয়াইয়ে, জুন মাসে অনুষ্ঠিত হবে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিতীয় বাণিজ্য সংলাপ, এছাড়াও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্যিক দল বাংলাদেশ সফর করবে।
এ সকল কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতা কেবল আমাদের নিজস্ব জনগণের জন্যই উপকার বয়ে আনছে না বিশ্বময় শান্তি সমৃদ্ধি অগ্রসর তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখছে, বলেন রাষ্ট্রদূত।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অফ অনার হিসেবে রাখা বক্তব্যে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন ইউএস এআইডির ডেপুটি এডমিন্সট্রেটর ইসোবেল কোলম্যান। তিনি বাংলাদেশ যেসব খাতে অগ্রসর হয়ে বিশ্ব অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে তা উল্লেখ করে বলেন, আমি লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরেই তার জনগণের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পেরেছে। এবং বিশ্বের কাছে সাফল্যের উদাহরণ হয়ে ধরা দিয়েছে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ যে অগ্রসরতা নিশ্চিত করেছে তা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ও উদযাপনের দাবি রাখে, বলেন ইসোবেল।
তিনি বলেন, আজ বিশ্বের অগ্রসরমান অর্থনীতির কাছে বাংলাদেশ একটি মডেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।
সবশেষে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, আজ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের এই সন্ধ্যায় আপনাদের সবার সামনে উপস্থিত হতে পেরে খুশি লাগছে। মোমেন বলেন, আজ দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিংকেনের সঙ্গে অত্যন্ত সফল একটি বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে এছাড়া ইউএসএআইডির প্রধান সামান্থা পাওয়ারের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে এবং দুটি বৈঠকই ছিল ফলপ্রসূ।
তিনি বলেন, আমরা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক সম্পর্ক কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছি।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঠানো চিঠির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন ড. মোমেন। বাইডেন তার চিঠিতে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ- যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকগুলো উল্লেখ করে বলেছেন বাংলাদেশ এখন অগ্রসরতার দিক থেকে একটি মডেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভালো বন্ধু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বাইডেন আশা প্রকাশ করেছেন আগামী ৫৯ বছরে দুই দেশের জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় থাকবে।
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব নাগরিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিশিষ্ট জন বাংলাদেশের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন তাদের স্মরণ করে ড. মোমেন বলেন, জাতিসংঘে যখন বাংলাদেশের সদস্য পদ নিয়ে ভোটাভুটি হয় তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ বুশ ১৬ বার ভোটাভুটির মধ্যে ১৫ বারই বাংলাদেশের পক্ষে তার ভোট দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ গভীরভাবে মূল্যায়ন করে এমনটা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংহতি ও সাধারণ মূল্যবোধের ভিত্তিতে গঠিত এই সম্পর্ক। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আর্থ- সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে দুই দেশ একসাথে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সংসদ সদস্য নাহিন রাজ্জাক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল ওয়ার উজ-জামান, হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল সিকিউরিট কাউন্সিলের সিনিয়র ডিরেক্টর সুমনা গুহ, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পররাষ্ট্র উপসহকারী মন্ত্রী কেলি কিডারলিং, ইউএসএআইডি'র ডেপুটি অ্যাসিট্যান্ট এডমিন্সট্রেটর মিজ অঞ্জলি কৌর, নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল ড. মনিরুল ইসলাম, লসএঞ্জেলসের কনসাল জেনারেল সামিয়া আনজুম, বাংলাদেশ নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া গ্রুপ ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়ার এমডি সায়েম সোবহান আনভীর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিস সরাফত, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াস্থ আইগ্লোবাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপ, প্রেসিডেন্ট ড. হাসান কারাবার্ক, সিএফও ফারহানা হানিপ, ভয়েস অব আমেরিকার সাবেক প্রধান রোকেয়া হায়দার, আনিস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের কমিউনিকেশন ডাইরেকটর বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহমেদ এবং কোষাধক্ষ বিশ্ববাংলা টোয়েন্টি ফোর টিভির সিইও আলিম খান আকাশ, ডেমক্র্যাটিক পার্টির নেতা মোর্শেদ আলম, অধ্যাপক আদনান মোর্শেদ প্রমুখ।
পরে একটি কেক কেটে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর সেলিব্রেট করা হয়।
সবশেষে ছিলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি কবিতা পড়ে শোনান যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের . । এছাড়া পরিবেশিত হয় একটি নৃত্যাল্লেখ্য। যার পরিবেশনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশুরা।
মুখোরোচক নৈশভোজের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।
