যুক্তরাষ্ট্র

এনওয়াইপিডিতে বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অফিসার: গর্ব ও সাফল্যের নতুন অধ্যায়

post-img

নূর এলাহী মিনা, নিউইয়র্ক

যতদুর জানা যায় সংস্থা হিসেবে প্রথম পুলিশি ব্যবস্থার সুত্রপাত হয় খ্রীস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে, মিশরীয় সভ্যতায়। ঠিক সমসাময়িক সময়ে ইউরোপীয় সভ্যতাসমূহেও কোনো না কোনো ধারায় পুলিশি ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। নরম্যানদের ইংল্যান্ড বিজয়ের আগে ১০৬৬ সাল থেকে ইংল্যান্ডে সূচনা হয়েছিল অপেক্ষাকৃত পরিশীলিত এক পুলিশি ব্যবস্থা। এটি ছিল সম্প্রদায়ভিত্তিক। স্যাক্সন ফ্র্যাঙ্কপ্লেজ (অ্যাংলো-স্যাক্সন সিস্টেম) এর আওতায় পরিচালিত এই ব্যবস্থায় সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ একে অপরের সদাচরণের জন্য দায়ী থাকতেন এবং তাদের আরও দায় ছিল একত্রিতভাবে সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখার। আরও পরে ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ রবার্ট পিল, আধুনিক পুলিশিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে যার কথা বলা হয়ে থাকে, ‘গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের নীতি’ চালু করেন। পুলিশ শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ polis থেকে, যার অর্থ "শহর"।

এসব তথ্যে ধারণা করা যায়, সভ্যতার সূচনালগ্নে যে সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, পুলিশ তার মধ্যে অন্যতম। যুগে যুগে কালে কালে সকল তর্ক-বিতর্কের বাইরে এসে একটিই প্রতিষ্ঠিত সত্য পুলিশ বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য, তা হলো ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’। ‘পরিক্ষীত বন্ধু’।


২০১৭ সালের কথা। তখন কোনো এক কারণে আমার থার্ড গ্রেডার কন্যাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাস্তায় বিপদে পড়লে প্রথমে কার কাছে সাহায্য চাইবে? তার সহজ উত্তর ছিল ‘পুলিশ’। কারন ক্লাস টিচার এটি তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। সকালে বাচ্চাদেরকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় দেখি প্রতিটি ক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালন করেন স্কুল পুলিশ সদস্যরা। পরম যত্নে ও নিরাপত্তার সাথে বাচ্চাদের স্কুল অব্দি পৌঁছে দেন তাঁরা। স্কুল চলাকালে ফ্রন্ট ডেস্কেও দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সদস্যরা। ‘৯১১’ নিউইয়র্কের বিশ্বস্ত তিনটি ডিজিট। যার ওপর ভরসা করে বাঁচেন এই নগরবাসী। কল হলে মূহুর্তের মধ্যে পৌঁছে যাবে পুলিশ আপনার ঠিকানায়, পরের সকল দায়িত্ব তাঁদের। এমন হাজারো মানবীয় উদাহরণ রয়েছে পুলিশকে ঘিরে, সারা পৃথিবীতেই।

আমার এই আলোচনা অবশ্য সকল পুলিশ কিংবা পুলিশ বাহিনী নিয়ে নয়। বরং সুনির্দিষ্ট করে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)’-তে বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অফিসারদের গৌরবগাঁথা নিয়ে। এটি আমেরিকার মতো দেশে বাংলাদেশিদের একটি বড় অর্জন বলেই আমি বোধ করি। 

ডেটলাইন ৩১ মে ২০২২, সন্ধ্যা। লোয়ার ম্যানহাটানের ওয়ান পুলিশ প্লাজা। এটি এনওয়াইপিডি’র সদরদপ্তর। এর সুপরিসর অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “এশিয়ান হেরিটেজ সেলিব্রেশন ২০২২”। অনুষ্ঠানটিতে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। এনওয়াইপিডি’র ভ্রাতৃবৎ (Fraternal) সংস্থাসমূহের এশিয়ান অংশ সেদিন প্রদর্শণ করেছিল তাদের সম্মৃদ্ধ ঐতিহ্যের নানা দিক। সাথে ছিল আবহমান সংস্কৃতির অন্যতম অনুসঙ্গ ‘খাবার’। একে একে মঞ্চে এলো এশিয়ান জাদে (Jade), কোরিয়ান আমেরিকান অফিসার্স এসোসিয়েশন, দেশি সোসাইটি, বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন, ইন্ডিয়ান অফিসার্স সোসাইটি, পাকিস্তানি অ্যামেরিকান ল' এনফোর্সমেন্ট সোসাইটি, ও শিখ (Sikh) অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। নিউইয়র্কের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক সংগঠন “বাপা” গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করল বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে। হল জুড়ে ভেসে এলো রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনা... “চেনা শোনার কোন বাইরে..”; আর হাল সময়ের দুর্দান্ত জনপ্রিয় “চলো বাংলাদেশ, চলো বিজয়ের টানে চলো বাংলাদেশ, চলো বিশ্ব উঠানে চলো বাংলাদেশ..”। গানের সাথে মনকাড়া নৃত্য।

একটি টেবিলে বসে আছি। আশেপাশে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ। খাবারের প্লেটে বিরিয়ানি, বাংলাদেশি মিষ্টি, মুরগির কোর্মা, ও বিভিন্ন দেশি ফিঙ্গার ফুড। এছাড়া রয়েছে ভারতীয়, কোরীয়সহ অন্যান্য আমেরিকান-এশিয়ান সংমিশ্রণের খাবার। পাশের সাংবাদিক বন্ধুটি বলে উঠলেন, “ভাবা যায়, এনওয়াইপিডি হেডকোয়ার্টারে বসে বাঙালি খাবার খাচ্ছি!”। মৃদ্যু হেসে বললাম, যা ভাবা যেতনা, তা এখন বাস্তবতা। সুদীর্ঘ পথচলায় এনওয়াইপিডির বাঙালি অফিসার ভাইয়েরা এটি অর্জন করেছেন, আমরা আজ তার স্বাক্ষী। দৃঢ়তার সাথে বললাম, হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশি অফিসারদের মধ্য থেকে কেউ চিফ অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হবেন, পুলিশ কমিশনার হবেন।

বর্তমানে ১৬০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি অফিসার এনওয়াইপিডির বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৫৩২ জন ইউনিফর্মড অফিসার এবং ১১০০ সিভিলিয়ান। রয়েছেন ৪ জন ক্যাপ্টেন, ১ জন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার, ১০ জন লেফটেন্যান্ট, ৪০ সার্জেন্ট ও ১২ জন ডিটেক্টিভ। সিভিলিয়ান (আন-আর্মড) পুলিশ সদস্যরা স্কুল সেফটি এজেন্ট, ট্রাফিক এজেন্ট, স্কুল ক্রসসিং গার্ড হিসাবে কর্মরত।

এখানে পুলিশ বাহিনীর পদক্রমের প্রাথমিক ধাপে যোগ দিতে হয় ক্যাডেট প্রবেশনারি পুলিশ অফিসার হিসেবে। প্রশিক্ষণ ও প্রবেশনারি পেরিয়ড শেষে পুলিশ অফিসার হিসবে পদায়িত হন। এরপর সার্জেন্ট থেকে লেফটেন্যান্ট, লেফটেন্যান্ট থেকে ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন থেকে ডেপুটি ইন্সপেক্টর, ডেপুটি ইন্সপেক্টর থেকে ডেপুটি চিফ এবং ডেপুটি চিফ থেকে অ্যাসিসট্যান্ট চিফ, সেপদ থেকে চিফ হয়ে হন চিফ অব দ্য ডিপার্টমেন্ট এবং সবশেষে সর্বোচ্চ পদ পুলিশ কমিশনার। এছাড়া ডিটেকটিভদের জন্য রয়েছে সার্জেন্ট থেকে ক্যাপ্টন পর্যন্ত আলাদা পদবিন্যাস। অফিসার থেকে ক্যাপ্টেন পর্যন্ত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। ক্যাপ্টেন থেকে শীর্ষপদ পর্যন্ত আর কোনো পরীক্ষা নেই। দক্ষতা ও যোগ্যতার আলোকে সিটি মেয়রের সুপারিশে এসকল কর্মকর্তা চিফ অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট এমনকি পুলিশ কমিশনার পর্যন্ত হতে পারেন। তবে বলে রাখা ভালো চিফ অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হচ্ছেন ইউনিফর্মধারী পুলিশের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ পদ, এটি চার তারকা মর্যাদার। পুলিশ বাহিনীর অভিভাবক হিসেবে সিটি মেয়র পুলিশ কমিশনার নিয়োগ দেন। তিনি যে কোনো ব্যক্তি হতে পারেন, তবে অব্যশই আইন-শৃঙ্খলা বা পুলিশিং সংক্রান্ত পড়াশোনা বা জ্ঞানধারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এটি পাঁচ তারকা মর্যাদার। এছাড়া ডেপুটি কমিশনার বা ফার্স্ট ডেপুটি কমিশনার পদে যে কোনো কাউকে (প্রযোজ্য যোগ্যতাসম্পন্ন) নিয়োগ দিতে পারেন মেয়র। ফার্স্ট ডেপুটি কমিশনার পদটি সিভিলিয়ান পদ হলেও তা চার-তারকা মর্যাদার। বর্তমানে একজন সাংবাদিক জন মিলার এনওয়াইপিডি’র ডেপুটি কমিশনার এর দায়িত্ব পালন করছেন।

যাহোক আবার ফিরে আসি বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তাদের সফল্যগাঁথা নিয়ে। এনওয়াইপিডির ৬৯ প্রিসিঙ্কট'র কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্যাপ্টেন খন্দকার আব্দুল্লাহ। প্রথম বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশিয়ান হিসেবে এনওয়াইপিডির গোয়েন্দা স্কোয়াডে লেফট্যানেন্ট কমান্ডার পদে দায়িত্ব পালন করছেন শামসুল হক। এছাড়া ক্যাপ্টেন কারাম চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মিলাদ খান, ক্যাপ্টেন পারুল আহমেদ নগরীর বিভিন্ন ডিভিশনে নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। ট্রাফিক ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মোহাম্মদ রহমান ও আনোয়ারুল কাদির। সিটি মেয়র এরিক অ্যাডামস এর এক্সিকিউটিভ ডিটেইলে রয়েছেন সার্জেন্ট এরশাদ সিদ্দিকী ও সার্জেন্ট হুমায়ুন কবীর।

১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এনওয়াইপিডি যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম পুলিশি প্রতিষ্ঠান, যার রয়েছে ৩৬ হাজার অফিসার এবং ১৯ হাজার সিভিলিয়ান সদস্য। প্রত্যাশা, হাডসন ও ইস্ট নদীর প্রবাহের মতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবেন এনওয়াইপিডিতে কর্মরত বাংলাদেশি অফিসাররা। কোন একদিন হয়তো নির্ঘুম এই নিউইয়র্ক নগরীর জল-স্থল-অন্তরীক্ষের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বিধানের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবেন কোনো এক বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অফিসার; যাঁর অবয়বে থাকবে বজ্রকঠিন দৃঢ়তা, অসম সাহস- কারণ তার পূর্বপুরুষগণ যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেটি অদম্য এক জাতিরাষ্ট্র, যেটি অদম্য এক দেশ -বাংলাদেশ; যার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান।

আবার এমনই উষ্ণ বা শীত শীত কোন সন্ধ্যায় আলোঝলমল নিউইয়র্কের মঞ্চ কাঁপিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠবে বাংলাদেশি কোনো দল .. “চলো বাংলাদেশ, চলো বিজয়ের টানে চলো বাংলাদেশ, চলো বিশ্ব উঠানে চলো বাংলাদেশ..”। 

কৃতজ্ঞতা জামিল সারোয়ারের প্রতি। খ্যাতনামা ডিটেকটিভ, এনওয়াইপিডি। তিনি লেখাটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.