যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে সোমবার অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)'র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য শোক ও স্মৃতিচারণ। এতে অংশ নিয়ে একজন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক তথা ব্যক্তি খালেদা জিয়ার সকল উজ্জ্বলতা ও দৃঢ়তার কথা বললেন আলোচকরা।
একসময়ে বাংলাদেশ নিযুক্ত দুই মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ সাংবাদিক, শিক্ষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই আলোচনায় অংশ নেন।
একসময়ে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বে তার প্রেসউইংয়ে কর্মরত, বর্তমানে মেক্সিকোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর উদ্যোগ ও আয়োজনে এই শোকসভায় বক্তব্য রাখেন অ্যাটর্নি এহতেশামুল হক, ভয়েস অব আমেরিকার সাবেক প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনা ও মার্শা বার্নিকাট, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মার্ক শেফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যারন বেলকাইন্ড প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রটেক্টর এবং অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিরোধী মতের কণ্ঠ রুদ্ধ, তখন তিনি নির্ভীক চিত্তে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।"
খালেদা জিয়া ছিলেন বিশ্বে নজির সৃষ্টিকারী এক অনন্য নেতা, বলেন মুশফিকুল ফজল।
খালেদা জিয়ার ওপর সংক্ষিপ্ত জীবনালাপ তুলে ধরেন এটর্নি এহতেশামুল হক। খালেদা জিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশিদের অত্যন্ত জনপ্রিয় স্লোগান- নেত্রী মোদের খালেদা, গর্ব মোদের আলাদা'র কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সকল জীবন কর্মই ছিলো গর্ব করার মতো। একজন গৃহবধু থেকে রাজনীতিতে এসে কিভাবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া তারই ধারবাহিকতা উঠে আসে এহতেশামুল হকের বক্তৃতায়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে খালেদা জিয়া যতবার যত আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেন, তার সবগুলোতেই জয়ী হন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।
সারা জীবন জুড়েই খালেদা জিয়া দেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে আপোষহীন থেকেছেন। নিজের জীবনে নানাভাবে রাজনৈতিক দুর্যোগ নেমে আসার পরেও, কারান্তরীণ থেকেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, উঠে আসে তার আলোচনায়। তিনি বলেন, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি। খালেদা জিয়ার নৈতিক সাহস ও গণতন্ত্রের পক্ষে নিরবচ্ছিন্ন লড়াইই তাকে দেশের মানুষের কাছে প্রিয় করে তোলে।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি স্তরে স্তরে খালেদা জিয়া তার অবদান রেখে গেছেন। আর সে কারণেই তিনি স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন, বলেন এহতেশামুল হক।
বক্তাদের সকলেই তাদের স্মৃতিচারণে খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম তথা সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করেন।
দুই রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ও ড্যান মজেনা তাদের বক্তৃতায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের সকল সাক্ষাত ও বৈঠকের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেসব বৈঠক কূটনীতিক চরিত্রের বাইরেও অত্যন্ত আন্তরিক ও প্রাণবন্ত হতো। আর তা খালেদা জিয়ার কারণেই হতো। তিনি তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবরই নিতেন।
ড্যান মজেনা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া অন্যকে সম্মান দিয়ে নিজেও সম্মানিত হতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন্যদের খোঁজখবর নিতেন। গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করেন তিনি।
"আমার দায়িত্ব পালনকালে বিরোধীদলে ছিলেন খালেদা জিয়া। সবাই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারতো। তিনি সবার সঙ্গে যোগেযাগের বিষয়টি সহজ করে রেখেছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে যখনি দেখা করতে গিয়েছি তিনি সময় দিয়েছেন," বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।
অপর সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট জানান, বাংলাদেশে দায়িত্বপালন কালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার অনেকবার দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, "খুব বিপদ এবং সংকটের মধ্যেও তিনি হাস্যোজ্জ্বল এবং আন্তরিক থাকতেন।"
"একজন নারী হিসাবে বাংলাদেশকে খালেদা জিয়া যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তা এশিয়া উপমহাদেশে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন তার লিগ্যাসি স্মরণে রাখবে মানুষ," বলেন বার্নিকাট।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অনন্য ব্যক্তিত্বের কথাও উঠে আসে সকল বক্তার বক্তৃতায়।
সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে ধারাবাহিক অগ্রসরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি রাজনীতির হাল ধরতে বাধ্য হন। সমর্থকদের চাপেই বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করেন।"
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারকে সবচেয়ে জনপ্রিয় উল্লেখ করে বলেন, "গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।"
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মার্ক শেফ খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার মৃত্যুতে এই স্মরণসভা আয়োজন করতে পেরে ন্যাশনাল প্রেসক্লাব গর্বিত।
ম্যারন বিলকাইন্ড বলেন , বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়- গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটি রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়। যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন তারাই ইতিহাস গড়েন না, বরং যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধৈর্য ও সাহস নিয়ে লড়াই করেন, তাঁরাই ইতিহাসের নায়ক হয়ে থাকেন।
আলোচনার আগে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যা উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ডিসি-ম্যারিল্যান্ড-ভার্জিনিয়ায় বসবাসকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন।
